Islam (ইসলাম), Sin (গুনাহ)

Starting Good or Bad Deed and Continuing in Sin (ভাল বা খারাপ কাজের সূচনা, পাপ-পুণ্যের ধারা ও গুনাহে জারিয়া)

ভাল বা খারাপ কাজের সূচনা, পাপ-পুণ্যের ধারা ও গুনাহে জারিয়া

নেক কাজের সূচনা করা যথেষ্ট কঠিন। সূচনাকারীকে কত বাধা-বিপত্তি পাড়ি দিতে হয়! কত ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়! এসব কিছু পেছনে ফেলে একটি নেক কাজের ভিত্তি স্থাপন করলে পরবর্তী সময়ে যারা ঐ কাজ করবে তাদের সকলের সমপরিমাণ সওয়াব সে পাবে।

২২৪১-(৬৯/১০১৭) মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না আল আনাযী (রহঃ) ….. মুনযির ইবনু জারীর থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত।
তিনি বলেছেন, আমরা ভোরের দিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় তার কাছে পাদুকাবিহীন, বস্ত্রহীন, গলায় চামড়ার আবা পরিহিত এবং নিজেদের তরবারি ঝুলন্ত অবস্থায় একদল লোক আসল। এদের অধিকাংশ কিংবা সকলেই মুযার গোত্রের লোক ছিল। অভাব অনটনে তাদের এ করুণ অবস্থা দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখমণ্ডল পরিবর্তিত ও বিষন্ন হয়ে গেল। তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন, অতঃপর বেরিয়ে আসলেন। তিনি বিলাল (রাযিঃ) কে আযান দিতে নির্দেশ দিলেন। বিলাল (রাযিঃ) আযান ও ইকামাত দিলেন।
সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) শেষ করে তিনি উপস্থিত মুসল্লীদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং এ আয়াত পাঠ করলেনঃ
“হে মানব জাতি! তোমরা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র ব্যক্তি থেকে আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। ….. নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী”- (সূরা আন নিসা ৪ঃ ১)।
অতঃপর তিনি সূরা হাশরের শেষের দিকের এ আয়াত পাঠ করলেনঃ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভবিষ্যতের জন্য কী সঞ্চয় করেছে সেদিকে লক্ষ্য করে”- (সুরাহ আল হাশর ৫৯ঃ ১৮)।

অতঃপর উপস্থিত লোকদের কেউ তার দীনার, কেউ দিরহাম, কেউ কাপড়, কেউ এক সা’ আটা ও কেউ এক সা খেজুর দান করল। অবশেষে তিনি বললেন, অন্ততঃ এক টুকরা খেজুর হলেও নিয়ে আসো। বর্ণনাকারী বলেন, আনসার সম্পপ্রদায়ের এক ব্যক্তি একটি বিরাট থলি নিয়ে আসলেন। এর ভারে তার হাত অবসাদগ্ৰস্ত হয়ে যাচ্ছিল কিংবা অবশ হয়ে গেল। রাবী আরো বলেন, অতঃপর লোকেরা সারিবদ্ধভাবে একের পর এক দান করতে থাকল। ফলে খাদ্য ও কাপড়ের দু’টি স্তুপ হয়ে গেল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারক খাটি সোনার ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে হাসতে লাগল।

অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
“যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোন উত্তম প্রথা বা কাজের প্রচলন করে সে তার এক কাজের সাওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা তার এ কাজ দেখে তা করবে সে এর বিনিময়েও সাওয়াব পাবে। তবে এতে তাদের সাওয়াব কোন অংশে কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলামের পরিপন্থী) কোন খারাপ প্রথা বা কাজের প্রচলন করবে, তাকে তার এ কাজের বোঝা (গুনাহ এবং শাস্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা তাকে অনুসরণ করে এ কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ বোঝাও তাকে বইতে হবে। তবে এতে তাদের অপরাধ ও শাস্তি কোন অংশেই কমবে না।”

(হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ২২৪১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২২২০, ইসলামীক সেন্টার ২২২১)

নবীজীর ইরশাদ-

مَنْ أَحْيَا سُنَّةً مِنْ سُنَّتِي قَدْ أُمِيتَتْ بَعْدِي، فَإِنَّ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلَ مَنْ عَمِلَ بِهَا…

যে আমার পরে একটি মৃত সুন্নাহ জীবিত করবে সে পরবর্তীতে যারা এ অনুযায়ী আমল করে, তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমবে না। আর যে এমন কোনো নবআবিষ্কৃত বিষয় উদ্ভাবন করবে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পছন্দ নয়, পরবর্তীতে যারা এ অনুযায়ী আমল করে, তাদের সমপরিমাণ গোনাহ তার উপর বর্তাবে। তবে তাদের গোনাহ বিন্দুপরিমাণও কমবে না।
-জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৭

হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ…

যে মানুষকে হেদায়েতের দিকে ডাকে পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করে তাদের অনুরূপ সওয়াব তাকে দান করা হবে। তবে ওদের সওয়াব বিন্দুপরিমাণও কমবে না। আর যে গোমরাহীর দিকে ডাকে পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করে তাদের সমপরিমাণ গোনাহ তাকে বহন করতে হবে। এতে ওদের গোনাহ সামান্য পরিমাণও কমবে না।
-সহীহ মুসলিম, হাদীস  ২৬৭৪


কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

لِیَحْمِلُوْۤا اَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً یَّوْمَ الْقِیٰمَةِ وَ مِنْ اَوْزَارِ الَّذِیْنَ یُضِلُّوْنَهُمْ بِغَیْرِ عِلْمٍ اَلَا سَآءَ مَا یَزِرُوْنَ.

কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের (কৃত গোনাহের) পরিপূর্ণ ভারও বহন করবে এবং তাদেরও ভারের একটা অংশ, যাদেরকে তারা অজ্ঞতার কারণে বিপথগামী করছে। -সূরা নাহল (১৬) : ২৫

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-

وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ.

তারা নিজেদের গোনাহের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। -সূরা আনকাবুত (২৯) : ১৩


নবীজীর ইরশাদ-

لاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا، إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا، لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ القَتْلَ.

যে কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে এর গোনাহের একটা অংশ প্রথম আদম সন্তানের উপর বর্তাবে। কারণ সেই প্রথম হত্যার প্রবর্তন করেছে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩৩৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৭৭


আর এগুলো গোনাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া শরীয়তের বিধান ‘একজনের গোনাহের বোঝা আরেকজনের উপর বর্তাবে না’- এর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, একজনের গোনাহের ভার আরেকজনের উপর বর্তাবে না; যদি এর সাথে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না থাকে। অন্যথায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার উপরও এর একাংশ গোনাহ বর্তাবে। বলাই বাহুল্য, এটা অন্যের বোঝা নয়, নিজেরই সংশ্লিষ্টতার বোঝা।


সূরা নাহলের ২৫ নং আয়াতের তাফসীরে শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রাহ. (৯২৬ হি.) বলেন,

তারা নিজেদের কুফ্র অবলম্বনের বোঝা বহন করবে। সেই সাথে তাদের কারণে যারা বিপথগামী হয়েছে তাদেরও পুরোপুরি বা আংশিক গোনাহ। আর আল্লাহর ইরশাদ-  وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰی

এর অর্থ হল, যেখানে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই- না কারণগত না অন্য কোনোভাবে। -ফাতহুর রহমান পৃ. ৩০৪


খলীল আহমদ সাহারানপুরী রাহ. (১৩৪৬হি.) من دعا إلى هدى হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন,

‘তুমি যদি প্রশ্ন কর, এ তো বাহ্যিকভাবে আল্লাহর ইরশাদ, وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰی -এর সাথে সাংঘর্ষিক?

আমি বলব, উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ গোমরাহীর দিকে আহ্বানকারী অনুসরণকারীদের গোনাহ বহন করেনি; বরং তারা যে তার কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে সেটার গোনাহ বহন করেছে।’ -বাযলুল মাজহুদ ১৩/৩৭

 

এজন্য গোনাহের ধারা চলমান থাকে এমন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।


অর্থাৎ সাদকায়ে জারিয়া যেমন আছে তেমনি গুনাহে জারিয়াও আছে।

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=49328/

=========================================

গুনাহে জারিয়া

প্রসিদ্ধ অর্থোপেডিক সার্জন। তিনি আইনুশ শামস বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডেপুটি ডিন এবং মিশরের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। তিনি সব দিক দিয়েই প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ডা. রাযী ৫ জুন হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। তাঁকে পূর্ব কায়রোর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালটি ছিল তাঁর বন্ধুর। তিনিও দেশের বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট। ডা. রাযীর শারীরিক অবস্থা খুব একটা গুরুতর ছিল না। তিনি এর আগেও এই হাসপাতালে এবং একই ডাক্তারের কাছে অপারেশন করিয়েছিলেন। তাই সমস্ত কেস নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ডা. রাযীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার ‘কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন’ শুরু হয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে হার্ট চেম্বারে একটি সূক্ষ্ম ইলাস্টিক টিউব (ক্যাথেটার) প্রবেশ করানো হয়। এটি রোগীর রোগ নির্ণয় করে। ক্যাথেটারাইজেশন কর্মী খুব দক্ষ ছিলেন না। তিনি সামান্য ভুল করে বসলেন। এই সামান্য ভুলের কারণে মিশরের প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও অর্থোপেডিক সার্জন অপারেশন টেবিলেই মারা যান। এটি বড় ধরনের সংবাদ ছিল। মিশরীয় মিডিয়া ঘটনাটিকে লুফে নিয়েছিল।

সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিও ক্যাথেটারাইজেশনকে দায়ী করে। এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ খবর। সারা বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। চিকিৎসাকর্মী ও চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে প্রতিদিন শত শত রোগী মারা যায়। কিন্তু এ খবর সাধারণ হয়েও অসাধারণ হল কেন?
কারণ মিশরে কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশনের জন্য ২০১৬ সালের আগে সার্জনের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা ও সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন ছিল। ডা. রাযী তার মেয়াদকালে অভিজ্ঞতা ও সার্টিফিকেশন কমিয়ে শত শত যুবককে প্র্যাক্টিসের অনুমতি দিয়েছিলেন।
তাঁর চিন্তা ছিল, সার্জারি সার্জন করেন। তাই সার্জন কোয়ালিফাইড ও অভিজ্ঞ হওয়া প্রয়োজন। সাপোর্টিং স্টাফরা অপারেশনের সময় কেবল ছুরি ও কাঁচি ধরে রাখে। এতে খুব বেশি সার্টিফিকেশন ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। তাই ডা. রাযীর অনুকম্পায় সার্জারির সাপোর্ট-স্টাফ বৃদ্ধি পায়। এভাবে ডাক্তার ও সার্জনদের ব্যক্তিগত অনুশীলন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডা. রাযী নিজেই অনভিজ্ঞ স্টাফের অনভিজ্ঞতার শিকারে পরিণত হন।

আমাদের বন্ধু রেজা বশির তারার এই পরিস্থিতিকে ‘গুনাহে জারিয়া’ বলে থাকেন। তিনি জাপানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। আমি গত মাসে জাপানে গিয়েছিলাম। রেজা বশির তারার আমাকে টোকিওর সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং রুপিং হিলসের ৫৪ তম তলায় নৈশভোজের দাওয়াত দিয়েছিলেন। নৈশভোজটি ছিল আড়ম্বরপূর্ণ; কিন্তু আমি তারার সাহেবের সঙ্গই বেশি উপভোগ করেছি।
গুনাহে জারিয়ার টার্ম ওই সাক্ষাতেরই নির্যাস ছিল। তারার সাহেবের বক্তব্য ছিল, আমরা জীবনে যেসব সৎকর্ম করি, তাকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়। বিশেষ বিশেষ নেককাজ সদকায়ে জারিয়া হলে আমাদের কিছু কিছু গুনাহ ও ভুলগুলোও ‘গুনাহে জারিয়া’। এগুলোর কুপ্রভাবও অনবরত চলতে থাকে এবং মানুষকে বছরের পর বছর বরং শত শত বছর এর পরিণতি ভোগ করতে হয়। আমাদের মৃত্যুর পরেও আমাদের খাতায় লিপিবদ্ধ হতে থাকে।

এ পয়েন্টটি আমার কাছে নতুন ছিল। আমি পয়েন্টটি নোট করে নিই। আমি আজকাল আবার কুরআনের অনুবাদ পড়ছি। আমার এক বন্ধু কয়েক বছর আগে ভারত থেকে একজন মাওলানা সাহেবের অনুবাদ আনিয়ে দিয়েছিলেন।

বিশ্বাস করুন, কুরআনের অনুবাদ আমার সমস্ত উপলব্ধি পরিবর্তন করে দিয়েছে। ইসলাম শুধু অতটুকুর নাম নয়, যা সচরাচর আমরা করে বা বুঝে থাকি। আল্লাহর বাণী সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এই ভিন্ন বাণীতে তিনি বারবার বলছেন, আপনি এই পৃথিবীতে যা করছেন তার জন্য আপনাকে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহি করতে হবে। ডা. আহমাদ ইমাদুদ্দীন রাযীর সঙ্গে এটাই ঘটেছে। তিনি তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের গ্রাসে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, মৃত্যুতে কি তিনি রক্ষা পেয়ে যাবেন? না, তার (ইচ্ছাকৃত) ভুল সিদ্ধান্তের দায় তাকে বহন করতে হবে। যতদিন মিশরের লোকেরা তার কারণে নিয়োগ হওয়া অযোগ্য লোকদের ভুল ‘কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশনে’র শিকার হতে থাকবে, ডা. রাযীর বোঝাও বাড়তে থাকবে। তাই আমাদেরও বেঁচে থাকা উচিত। এই ধরনের গুনাহ আমাদের দুনিয়ার জীবনে এবং আখেরাতে উভয় জগতেই দংশন করতে থাকবে।

অনেক দিন আগে একজন দায়রা জজের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তাঁর একটি হাত ছিল কাটা। আমি তাঁকে দুর্ঘটনার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলছিলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছেলে আমার মেয়ের ব্যাগ টান দেয়। আমার মেয়ে ব্যাগটি শক্ত করে ধরে। ফলে সেও বাইকের সাথে হেচড়াতে লাগল। আমি সাহায্যের জন্য ছুটে গেলে ডাকাতেরা আতঙ্কিত হয়ে গুলি চালায়। একটি গুলি আমার হাতে এবং অন্যটি মেয়ের মাথায় লাগে। মেয়ে সেখানেই মারা যায়। আমার হাতের ক্ষত বেশ খারাপ হয়ে ওঠে। ডাক্তার দুই মাস পরে হাত কেটে ফেলতে বাধ্য হন।’

এরপর তিনি ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিলে তিনি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমি আমার মেয়ে বা আমার হাতের জন্য কাঁদছি না। আমি অপরাধীদের কারণে কাঁদছি। আমি চাকরিকালে মাত্র কয়েক হাজার টাকার লোভে অনেক চোর-ডাকাত আসামীকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। প্রতিদিন আমার মনে হয়, আমাকে যে গুলি করেছে সে আমারই ছেড়ে দেওয়া কোনো অপরাধী হবে। এই অনুভূতি আমাকে আর বাঁচতে দিচ্ছে না।’

করাচিতে এক ট্রাফিক পুলিশ অফিসারের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাঁর গল্পটিও খুব বেদনাদায়ক। তাঁর পরিবার ভ্রমণে বের হয়েছিল। রাস্তার অপর পাশ থেকে একটি গাড়ি এসে তাদের গাড়িকে ধাক্কা দেয়। গাড়িটি ছোট ছিল। একেবারে খাদে গিয়ে পড়ে। অফিসারের পুরো পরিবার দুর্ঘটনায় মারা যায়।

তিনি তার ঘটনা শোনান। বলেন, আমি টাকার বিনিময়ে ড্রাইভিং ভালোভাবে জানে না— এমন ব্যক্তির জন্যও ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতাম। যারা রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্য করেছে তাদের কাছ থেকে এক-দুই হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিতাম।
আমার মনে হয়, যে আমার পরিবারকে হত্যা করেছে, সে অবশ্যই আমার থেকে পাওয়া লাইসেন্সধারী অথবা আমিই কোনো ছোট/বড় ভুলের পর তাকে ছেড়ে দিয়ে থাকব। পরে সে আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছে।

 

একইভাবে আমি শিক্ষা বোর্ডের একজন সাবেক চেয়ারম্যানকে পেয়েছি, যার পরিবার একটি নির্মাণাধীন সেতুর পিলার চাপায় নিহত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি শত শত অযোগ্য যুবককে মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছিলাম। হয়তো সেতুটি তাদের কারো হাতে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি আমার নিজের পরিবারের ওপর পড়েছিল।

একজন দুধওয়ালাকে পেয়েছিলাম। তাঁর তিনটি সন্তান ছিল। তিনজনই শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমার বাচ্চাদের শৈশবে দুধে অ্যালার্জি ছিল। তারা দুধ পান করতে পারত না। যার কারণে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে।

আমি বললাম, আজকাল এই রোগটি নিরাময়যোগ্য। আপনি একজন ভালো ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতেন!

 

তিনি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, জাভেদ সাহেব! দুনিয়ায় এই রোগের চিকিৎসা থাকবে; কিন্তু আমার বাচ্চারা এই চিকিৎসায় সেরে উঠতে পারবে না।

এই বিশ্বাসের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি একটি ভয়ানক গল্প বলেন, আমার পঞ্চাশটি মহিষ ছিল। আমি এগুলোর দুধ বিক্রি করতাম। আমি লোভে পড়ে বেশি দুধের জন্য মহিষকে ইনজেকশন দিতে শুরু করি। দুধে ডিটারজেন্ট পাউডার, ইউরিয়া সার ও পানি মিশিয়ে পরিমাণ বাড়াতে শুরু করি। আমি এটি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করি। কিন্তু মহান আল্লাহ আমার বাচ্চাদের জন্য দুধে অ্যালার্জি তৈরি করেছিলেন। আমি তাদের নিয়ে ঘুরতে থাকি। কোনো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে আমার চোখের সামনে ওই হাজারো শিশুর চেহারা ভেসে ওঠে, যাদেরকে আমি ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার মেশানো দুধ পান করিয়েছি। তাদের কী পরিণতি হয়েছে? তারা কি বেঁচে আছে? বেঁচে থাকলে তাদের পাকস্থলির কী অবস্থা? তাই আমি এই উপসংহারে পৌঁছেছি যে, আমার সন্তানদের রোগ অনিরামেয়। চিকিৎসা হয়ে থাকে রোগের, গুনাহের নয়; আর আমি একজন গুনাহগার।

 

কিছুদিন আগে আমি এক বন্ধুর অফিসে গিয়েছিলাম। সেদিন তাঁর ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ চলছিল। বন্ধু আমাকে বলে, এটা স্বজনপ্রীতির দুনিয়া। আমার কাছে প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্যও মন্ত্রীদের কাছ থেকে সুপারিশ আসছে।

তারপর চিরকুটের পুরো স্তুপ আমার সামনে রাখল। আমি আমার বন্ধুকে গুনাহে জারিয়ার তত্ত্ব শুনিয়ে বললাম, ‘তুমি তোমার কোনো সুপারিশকৃত ও অযোগ্য চাপরাশির হাতে মরতে চাইলে সমস্ত চাকরি এই চিরকুটগুলোতে ভাগ করে দাও। আর নিজের এবং নিজ পরিবারের সুরক্ষা চাইলে কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নাও। যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন কর। তুমিও সদকায়ে জারিয়ার অংশ হয়ে যাবে। তাদের এবং তাদের পরিবারের লোকদের দুআ দশকের পর দশক তোমার পরিবারকে রক্ষা করবে।

আমার বন্ধুর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। সে সব চিরকুট ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। পিএকে ডেকে বলল, ‘আমরা প্রার্থীদের তালিকা ঝুলাব না। তুমি তাদের সবাইকে অফিসে সরাসরি ডাকো। তাদের সরাসরি নিয়োগ দেব।

পিএ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘স্যার এনএবি’ (বাংলাদেশের দুদকের মতো সংস্থা)।

আমার বন্ধু উত্তর দিল, ‘আমি এই সেবামূলক কাজের জন্য জেলে যেতেও প্রস্তুত!’

———————————————————————-

[জাভেদ চৌধুরী। পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উপস্থাপক।
এক্সপ্রেস নিউজে (৯ জুলাই ২০২৩) গুনাহে জারিয়া শিরোনামে তাঁর লেখাটি ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। লেখক কোনো আলেম নন। তাই লেখাটির প্রতিটি অংশ ফিকহী বিচারে দেখার সুযোগ নেই। তবে এই লেখা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে অনেক কিছু। আলকাউসারের পাঠকদের জন্য এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হল।]

জাভেদ চৌধুরী
[অনুবাদ করেছেন : ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.