Islam (ইসলাম), Sadaqah, Sadaqah Jariyah, Waqf

Waqf (ওয়ক্‌ফ)

Waqf (ওয়ক্‌ফ)

দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের কর্মক্ষেত্র। এই কর্ম যাতে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দেওয়া যায়, সেজন্য মানুষকে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ, শক্তি-সামর্থ্য ও দিকনির্দেশনা দান করা হয়েছে। এসব কাজে লাগিয়ে একজন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি-ধন্য হতে পারে। দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানকে জ্যোতির্ময় করতে পারে। গড়ে তুলতে পারে নেক ও সওয়াবের প্রভূত সঞ্চয়।

এ প্রচেষ্টার সর্বশেষ সীমা হল মৃত্যু। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সমাপ্তি ঘটে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সকল সম্পর্ক। নিঃশেষ হয়ে যায় যাবতীয় কর্মক্ষমতা। না ভালো কাজের শক্তি থাকে, না মন্দ কাজের। না সওয়াব উপার্জনের সক্ষমতা থাকে, না গোনাহ কামানোর।

বুদ্ধিমানের কর্তব্য গোনাহ থেকে যথাসম্ভব বেঁচে থাকা। আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির পথে অগ্রগামী হওয়া এবং মৃত্যুর আগেই মৃত্যু ও তার পরের জীবনের যথোচিত প্রস্তুতি নেওয়া।

পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী নয়। সবাইকে চলে যেতে হয়। যাওয়ার সময় কেউ সঙ্গে যাবে না। যাবে শুধু নিজের কৃত আমল। কিয়ামতের দিন কঠিন সময়ে তারাই মুক্তি ও সফলকাম হবে যাদের সৎ আমলের পাল্লা ভারি হবে। আর মৃত্যুর পরও সৎ আমলের পাল্লা ভারি হতে পারে একমাত্র সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মৃত্যুর পর কবরে থাকা অবস্থায় বান্দার সাতটি আমলের প্রতিদান অব্যাহত থাকে,
(১) যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষা দেবে অথবা
(২) নদী খননের ব্যবস্থা করবে অথবা
(৩) কূপ খনন করবে অথবা
(৪) কোনো খেজুরগাছ রোপণ করবে অথবা
(৫) মসজিদ নির্মাণ করবে অথবা
(৬) কোরআন (তিলাওয়াতের জন্য অথবা এর আহকাম জীবনে বাস্তবায়নের জন্য) কাউকে দান করবে অথবা
(৭) এমন কোনো সন্তান রেখে যাবে, যে মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’
(মুসনাদে বাজজার : ৭২৮৯; সহিহুত তারগিব : ৭৩)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন মানুষ মারা যায় তখন তার আমল স্থগিত হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ছাড়া:
ক. সদকায়ে জারিয়া,
খ. ইলম, যার দ্বারা মানুষের উপকার হয় ও
গ. সুসন্তান, যে পিতামাতার জন্য দোয়া করে।
(সহিহ মুসলিম শরিফ: ১৬৩১, সহীহ ইবনে হিব্বান: ৯৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪১; সহীহ ইবনে খুযায়মা: ২৪৯৫)


ইমাম নববি হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, সদকায়ে জারিয়া হলো— ওয়াক্‌ফ
(শারহু মুসলিম : ১১/৮৫)

আল-খাত্বীব আশ্‌-শারবিনি (রহ.) বলেন, সদাকায়ে জারিয়াকে আলেমগণ ওয়াক্‌ফ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন; যেমনটি বলেছেন রাফেয়িওয়াক্‌ফ ছাড়া অন্যান্য দানগুলো জারি বা চলমান নয়।
(মুগনিল মুহতাজ : ৩/৫২২-৫২৩)

ফলাফল প্রাপ্তির স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে সাদকা দুই রকম। একটি সাধারণ সাদকা যা অস্থায়ী, আরেকটি সাদকায়ে জারিয়া। সাদকায়ে জারিয়া হচ্ছে উত্তম দান।


ওয়াকফ শুধু মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য।
রাসূল সা:-এর সাহাবিদের মধ্যে যাঁদেরই সামর্থ্য ছিল তাঁরা সবাই ওয়াকফ করেছেন।

‘যে ইসলামে কোনো উত্তম নিয়ম চালু করে, যে অনুযায়ী পরবর্তীতে আমল করা হয়, তার জন্য আমলকারীদের অনুরূপ সওয়াব লেখা হবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমানো হবে না। আর যে ইসলামে কোনো মন্দ নিয়ম চালু করে, যে অনুযায়ী পরবর্তীতে আমল করা হয়, তার জন্য আমলকারীদের অনুরূপ গোনাহ লেখা হবে। তাদের গোনাহ কিছুমাত্রও কমানো হবে না’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৭)।
অর্থাৎ সাদকায়ে জারিয়া যেমন আছে তেমনি গুনাহে জারিয়াও আছে।

সদকায়ে জারিয়া কিভাবে করা যাবে?

সাদকায়ে জারিয়া অবিনিময়যোগ্য দান। এর অন্যতম উদ্দেশ্য সামাজিক ও সামষ্টিক উপকার করা।
এটা হতে পারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু করলে বৃহত্তরভাবে উপকার করা যায়।

যেমন কেউ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করল আর কেউ শুধু একজন রোগীকে সেবা দিলো। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের মাধ্যমে এরকম বহু রোগীর সেবা করা সম্ভব।

রাসূল সা: বলেছেন, দুটি জিনিস মানুষের উন্নতির উপকরণ। একটি ‘উত্তম সন্তান’, অন্যটি সাদকায়ে জারিয়া

রক্ত, কিংবা অঙ্গ দান করা, বৃক্ষরোপণ, মানবতার কল্যাণে সহায়-সম্পদ ওয়াকফ করা, এতিমের লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়া, মসজিদ নির্মাণ কিংবা মসজিদে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দান, পানীয় জলের জন্য খাল খনন, কূপ খনন, কোরআন শিক্ষা দেওয়া বা শিক্ষার ব্যবস্থা করা, মানুষের চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা, কবরস্থানের জন্য জমি দান কিংবা জমি কিনতে আর্থিক সহায়তা, মৃতের দাফন-কাফনের ব্যয় জোগানো কিংবা মুসলমানদের কল্যাণে আসে এমন ইসলামী বই, তাফসির, হাদিস, ফিকাহশাস্ত্রের বই-পুস্তক মুদ্রণ কিংবা বিতরণে সহায়তা করা, অত্যাচারিত মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো, ভালো কাজ করা এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি সবই সাদকায়ে জারিয়া।

শুধু মানুষই নয়, আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সব সৃষ্টির কল্যাণে যে কোনো হিতকর কাজই সাদকায়ে জারিয়া হতে পারে। এমনকি নিঃস্বার্থ যেকোনো কল্যাণকর কাজই হতে পারে সাদকায়ে জারিয়া। যাতে দুনিয়ার কোনো ব্যক্তিস্বার্থ থাকে না।

জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মৌলিক বিষয় হিসেবে ইসলামের একটি বিধান ওয়াকফ। আরবে ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ওয়াক্ফ ব্যবস্থা স্বীকৃত। পরিবার ও সন্তানসন্ততির কল্যাণার্থে ব্যক্তিগত ওয়াকফ ব্যবস্থাও ইসলামে গোড়া থেকেই স্বীকৃত ছিল। 

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ওয়াকফর উদাহরণ হচ্ছে মসজিদে কোবা। ৬২২ সালে মদীনা মনোয়ারায় নির্মিত হয়।
তারও ছয় মাস পর ইসলামি ওয়াকফর দ্বিতীয় উদাহরণ মদিনার কেন্দ্রে মসজিদে নববী। রাসুল (সা.)-এর সময় থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে অনেক ওয়াকফ কার্যক্রম চালু হয়।

ওয়াকফ ইসলামের প্রমাণিত ও নির্দেশিত একটি বিষয়। 

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও উম্মতের ইজমার দ্বারা ওয়াকফ প্রমাণিত ও শরী‘আতসম্মত হয়। 

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হলো, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীস, হাদিসে এসেছে,
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা: খায়বারে কিছু জমি লাভ করেন। তিনি এ জমির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য রাসূল সা:-এর কাছে এলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি খায়বারে এমন উৎকৃষ্ট কিছু জমি লাভ করেছি, যা এর আগে আর কখনো পাইনি। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে কী আদেশ দেন?’ 

রাসূল সা: বলেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে জমির মূল স্বত্ব ওয়াকফে আবদ্ধ করতে এবং উৎপন্ন বস্তু সাদকা করতে পারো।’ 

বর্ণনাকারী ইবনে ওমর রা: বলেন, ওমর রা: এ শর্তে তা সাদকা (ওয়াকফ) করেন যে তা বিক্রি করা যাবে না, তা দান করা যাবে না এবং কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে না’।
(বুখারি: ২৫৮৬)

ফলে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর উৎপন্ন বস্তু অভাবগ্রস্ত, আত্মীয়-স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহর রাস্তায়, মুসাফিরও মেহমানদের জন্য সদকা করে দেন।


ওয়াক্ফ শরী‘আত সম্মত হওয়ার দলীলঃ

ইসলামে অর্থব্যবস্থাপনার দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত ও ওয়াক্ফ।
এই দুটি বিধান মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য খুবই জরুরি। 

কুরআন ও হাদিসে ওয়াক্ফ বিষয়ে সরাসরি কোনো দিক-নির্দেশনা না থাকলেও এই দুটি উৎসেই এ বিষয়ে যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। যাতে মুসলমানদের সম্পত্তি ওয়াকফ করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ঈমানদারগণকে উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ বলেন,
‘নামাজ আদায় কর ও আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা তোমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে তোমরা তা পাবে আল্লাহর নিকট। উহা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর।’
(সূরা মুজ্জাম্মিল-৭৩:২০)

হে বিশ্বাসীগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দান করেছি, তা থেকে তোমরা দান কর, সেই (শেষ বিচারের) দিন আসার পূর্বে, যেদিন কোন প্রকার ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না। আর অবিশ্বাসীরাই সীমালংঘনকারী।
(সূরা বাক্বারা ২ঃ২৫৪)

আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তোমরা তা হতে ব্যয় কর তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে (অন্যথা মৃত্যু আসলে সে বলবে,) ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।
(সূরা মুনাফিকূন ৬৩ঃ১০)

আমার বান্দাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আপনি বলুন, সালাত কায়েম করতে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করতে — সে দিনের আগে যে দিন থাকবে না কোন বেচা- কেনা এবং থাকবে না বন্ধুত্বও।
(সূরা ইবরাহীম ১৪ঃ৩১)

পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে আর সম্পদ দান করবে তাঁর ভালবাসায় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত দিবে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করবে অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে। তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।
(সূরা বাক্বারা ২ঃ১৭৭)


যারা আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ব্যয় করে, তাদের (দানের) তুলনা সেই বীজের মত, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্মিল, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন, বর্ধিত হারে দিয়ে থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।
(সূরা বাক্বারা ২ঃ২৬১)

যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন ও নিজেদের মনে (ঈমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশে নিজেদের ধন ব্যয় করে থাকে তাদের তুলনা সেই বাগানের ন্যায় যা উচ্চভূমিতে অবস্থিত, তাতে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে দ্বিগুণ ফল ধরে, যদি তাতে বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে শিশির বিন্দুই যথেষ্ট, তোমরা যা কিছুই কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।
(সূরা বাক্বারা ২ঃ২৬৫)

‘হে মুমিমনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই, তা থেকে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর।’
(সূরা বাকারা- ২:২৬৭)

ওয়াকফের শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচিতি:

ওয়াক্ফ  আরবি শব্দ, এটি হাবুস নামেও পরিচিত।
الوقف (ওয়াকফ) শব্দটি وقف এর মাসদার। এর বহুবচন أوقاف
ওয়াক্ফ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ চুক্তি বা উৎসর্গ। যেমন বলা হয়, কোনো কিছু ওয়াকফ করা, আটকে রাখা, উৎসর্গ করা, স্থগিত করা, আবদ্ধ করা, স্থির রাখা, নিবৃত্ত রাখা
সবগুলোই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

ওয়াকফ ইসলামি শরিয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা।
ওয়াক্ফ এর অর্থ ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে মুক্ত কোনো সম্পত্তি নিরাপদে হেফাজত করা।
আর পারিভাষিক অর্থে, বস্তুর মূল স্বত্ব ধরে রেখে (মালিকানায় রেখে) এর উপকারিতা ও সুবিধা প্রদান করা।

কোনো সম্পত্তি এর মালিক নিজের মালিকানা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সম্পত্তি ঘোষণা করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জনকল্যাণ বা জনসেবার জন্য উৎসর্গ করলে সেই উৎসর্গ করার কাজটিকে ওয়াকফ বলা হয়।
ওয়াকফ হলো নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে আল্লাহর মালিকানায় নিবেদিত করা।
এর মাধ্যমে এ সম্পদের মালিকানা ব্যক্তির কাছ থেকে বিলুপ্ত হয়। যে সম্পদ থেকে তিনি বা তার বংশধর কোনো মুনাফা ফিরে পেতে পারে না

ওয়াক্ফ দুটো বিষয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়: স্পষ্ট শব্দ এবং অস্পষ্ট ও ঈঙ্গিতপূর্ণ শব্দ

ওয়াকফের স্পষ্ট কিছু শব্দ আছে, তা হলো:
ওয়াকফ করার নির্দেশবহ কথার মাধ্যমে; যেমন এভাবে বলা যে,  আমি ওয়াকফ করলাম বা আমি এর মূল মালিকানা আটকে ওয়াকফ রাখলাম বা আমি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করলাম।
আমি এ স্থানটি ওয়াকফ করলাম কিংবা এ স্থানকে মসজিদ বানালাম।

আর ওয়াকফের অস্পষ্ট ও ঈঙ্গিতপূর্ণ শব্দ হলো:
আমি দান করলাম বা আমি এটি আমার জন্য হারাম করলাম বা আমি মানুষের জন্য সারাজীবনের জন্য দান করলাম।

তবে অস্পষ্ট ও ঈঙ্গিতপূর্ণ শব্দে ওয়াকফ করলে নিচের তিনটি জিনিসের যে কোনো একটি পাওয়া যেতে হবে।
১. ওয়াকফের নিয়ত করা। কেউ এসব শব্দ বলে ওয়াকফের নিয়ত করলে ওয়াকফ হয়ে যাবে।
২. এসব অস্পষ্ট ও ঈঙ্গিতপূর্ণ শব্দ বলার সাথে স্পষ্ট শব্দ পাওয়া গেলে বা অন্য ঈঙ্গিতপূর্ণ শব্দ পাওয়া যায় তাহলেও ওয়াকফ হবে। যেমন, এভাবে বলা,
“আমি এটি ওয়াকফ হিসেবে দান করলাম বা মূলস্বত্ব রেখে ওয়াকফ হিসেবে দান করলাম বা উৎসর্গ করলাম বা সারাজীবনের জন্য দান করলাম বা এটি আমার জন্য হারাম”।
৩. ওয়াকফের বস্তুটি নিম্নোক্ত শব্দাবলী দ্বারা বর্ণনা করা। যেমন, বলা – ওয়াকফের বস্তুটি আমার জন্য হারাম, তা বিক্রি করা যাবে না, তা দান করা যাবে না।

শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে যেমন ওয়াকফ করা যায় তেমনি ব্যক্তির কাজের দ্বারাও ওয়াকফ করা যায়। যেমন:
মানুষের প্রচলনে ওয়াকফ করা বুঝায় এমন কোন কর্মের মাধ্যমে; যেমন- কেউ তার ঘরকে অথবা নিজের জমিতে মসজিদ বানাল এবং মানুষকে সে স্থানে নামায আদায় করার সাধারণ অনুমতি দিল কিংবা তার জমিকে কবরস্থান বানাল এবং মানুষকে সে কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি দিল।

 

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের মুসলমান ওয়াক্ফ বৈধকরণ আইনে প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী: ওয়াক্ফ অর্থ কোনো মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনো অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়িভাবে দান করা যা মুসলিম আইনে ‘ধর্মীয়, পবিত্র বা সেবামূলক’ হিসেবে স্বীকৃত।

ওয়াকফ তিন ধরনেরঃ
এক. ওয়াকফ ফি লিল্লাহ অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য ওয়াকফ।
খাইরী তথা কল্যাণকর কাজে ওয়াকফ। কেবল ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ওয়াক্ফকে ওয়াক্ফ ফি লিল্লাহ বলা হয়। সম্পূর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত। সর্বসাধারণের জন্য ওয়াকফ।

দুই. ওয়াকফ আলাল আওলাদ অর্থাৎ ব্যক্তিগত / আহলী তথা পরিবার পরিজনের জন্য ওয়াকফ।
উৎসর্গকারীর নিজের জন্য, বা পরিবার বা বংশধরদের ভরণপোষণ বা  উপকারের জন্য যখন প্রভূতভাবে উৎসর্গ করা হয় তখন তাকে ওয়াক্ফ আলাল আওলাদ বলা হয়। আল্লাহর ওয়াস্তে ওয়ারিশেরা সুবিধাভোগী হবেন। 

তিন. মিশ্র ওয়াকফ।: মিশ্র ওয়াক্ফে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রকৃতির সর্বজনীন উদ্দেশ্য এবং উৎসর্গকারীর, তার পরিবার ও বংশধরদের ভরণ পোষণ- উভয় উদ্দেশ্যই রয়েছে।

একটি বৈধ ওয়াক্ফের ক্ষেত্রে এর শর্তাবলি:
১. এটি একটি স্থায়ী ব্যবস্থা, অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য ওয়াক্ফ করা যায় না;
২. এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়, একে স্থগিত বা মুলতবি করা যায় না;
৩. এটি একটি অপ্রত্যাহারযোগ্য আইনগত চুক্তি এবং
৪. ওয়াক্ফ সম্পত্তি কখনও বাজেয়াপ্ত করা যায় না।

ওয়াকিফ কি?
ওয়াকিফ অর্থ ওয়াক্‌ফ সৃষ্টিকারী যে কোন ব্যক্তি। দানশীল ব্যক্তি ওয়াকিফ বা দাতা হিসাবে পরিচিত।


ওয়াকিফ / ওয়াকফ দানকারীর শর্তসমূহ:
ওয়াকফকারীর মধ্যে কতিপয় শর্ত থাকতে হবে, নতুবা তার ওয়াকফ করা জায়েজ হবে না।
১. ওয়াকফকারীকে দান করার যোগ্য হতে হবে। অতএব, জবরদখলকারী ও যার মালিকানা এখনো স্থির হয়নি এমন লোকদের পক্ষ থেকে ওয়াকফ করা জায়েজ হবে না।
২. ওয়াকফকারী বিবেকবান, সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।  অতএব, পাগল ও বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না।
৩. ওয়াকফকারকে বালিগ তথা প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। অতএব, শিশুর ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না, চাই সে ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী হোক বা না হোক।
৪. বুদ্ধিমান হওয়া। অতএব, নির্বোধ লোকের ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না।

যেসব জিনিস ওয়াকফ করা যায়
ওয়াকফের স্থান তথা যেসব জিনিস ওয়াকফ করা যায় তা হলো, মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি; যা ব্যক্তির মালিকানায় বর্তমানে আছে। যেমন—জমি, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি অথবা স্থানান্তরযোগ্য জিনিস

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আর খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.)-এর ওপর তোমরা অবিচার করছো। কেননা সে তার বর্ম এবং অন্যান্য সস্পদ আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে।’
(বুখারি: ১৩৯৯)

আলেমরা একমত যে, মসজিদে মাদুর ও মোমবাতি ওয়াকফ করা নিন্দনীয় নয়। পরিধানের জন্য গয়না ওয়াকফ করা ও ধার দেওয়া জায়েজ। কেননা এগুলো উপকারী জিনিস। সুতরাং জায়গা-জমির মতো এগুলোও ওয়াকফ করা যাবে।

কুরতুবী বলেন: “বিশেষতঃ সেতু ও মসজিদ ওয়াক্ফ করার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোন মতভেদ নেই; অন্য ক্ষেত্রে মতভেদ আছে।”

ওয়াকফ যাতে বাস্তবায়ন করা যায় সে জন্য ওয়াকফকৃত বস্তুর শর্তসমূহ:
১, ওয়াকফকৃত বস্তুর মূল্য থাকতে হবে। যেমন, জায়গা-জমি ইত্যাদি।
২, ওয়াকফকৃত বস্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্ঞাত থাকা।
৩. ওয়াকফকৃত বস্তু ওয়াকফের সময় ওয়াকফকারীর মালিকানায় থাকা।
৪. ওয়াকফকৃত বস্তু সুনির্দিষ্ট হবে, অ্যাজমালি সম্পত্তি হতে পারবে না।
    অতএব, বহু মানুষের মালিকানাধীন কোনো বস্তুর একাংশ ওয়াকফ করা শুদ্ধ হবে না।
৫. ওয়াকফকৃত বস্তুতে অন্যের অধিকার সম্পৃক্ত না থাকা।
৬. ওয়াকফকৃত বস্তু দ্বারা ‘উরফ তথা প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী উপকার গ্রহণে সক্ষম হওয়া।
৭. ওয়াকফকৃত বস্তুতে বৈধ উপকার থাকা।
৮. ওয়াকফ নেকীর কাজে হতে হবে; যেমন- মসজিদ, সেতু, মিসকীন, পানির উৎস, ইলমী কিতাবপত্র, আত্মীয়স্বজন। কেননা ওয়াকফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র নৈকট্য হাছিল। নেকী নয় এমন খাতে ওয়াকফ করা সহিহ নয়। যেমন- কাফেরদের উপাসনালয়ের জন্য ওয়াকফ করা, নাস্তিক্যবাদী পুস্তকের জন্য ওয়াকফ করা, মাজারে বাতি জ্বালানো কিংবা সুগন্ধি দেওয়ার জন্য ওয়াকফ করা কিংবা মাজারের রক্ষকদের জন্য ওয়াকফ করা। কেননা এগুলো হচ্ছে গুনাহের কাজ, শিরক ও কুফরের কাজে সহযোগিতা করা।
৯. নির্দিষ্ট কারো জন্য ওয়াকফ করলে সে ওয়াকফ সঠিক হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে ঐ ওয়াকফ সম্পত্তির উপর সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। যেহেতু কারো জন্য ওয়াকফ করা মানে তাকে মালিক বানিয়ে দেওয়া। তাই যে ব্যক্তি মালিক হতে পারে না তার জন্য ওয়াকফ করা সহিহ নয়; যেমন মৃত ব্যক্তি বা পশু।
১০. ওয়াকফ সহিহ হওয়ার জন্য অবিলম্বে কার্যকরযোগ্য হওয়া শর্ত।
    তাই নির্দিষ্ট সময়কেন্দ্রিক ওয়াকফ কিংবা বিশেষ কিছুর সাথে সম্পৃক্ত করে ওয়াকফ করা সহিহ নয়। তবে কেউ যদি তার মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত করে ওয়াকফ করে তাহলে সহিহ হবে। যেমন কেউ বলল যে, আমি যদি মারা যাই তাহলে আমার ঘরটি গরীবদের জন্য ওয়াকফ। যেহেতু আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, “উমর (রাঃ) ওসিয়ত করে গেছেন যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে ‘সামগ’ (তার একটি জমি) সদকা।” এ বিষয়টি সবাই জেনেছে। কিন্তু কেউ এর বিরোধিতা করেননি। সুতরাং এটি ইজমা (সর্বসম্মত অভিমত)। মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত ওয়াকফ সম্পদের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে করা যাবে। কারণ তা ওসিয়তের পর্যায়ভুক্ত।

ওয়াকফকৃত বস্তু থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি
নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ওয়াকফকৃত বস্তু থেকে উপকার অর্জন করা যায়:
ঘর-বাড়িতে বসবাস করে,
আরোহণকারী পশু ও যানবাহনে আরোহণ করে,
জীবজন্তুর পশম, দুধ, ডিম, লোম সংগ্রহ করে উপকার নেওয়া যায়।


ওয়াক্‌ফ এস্টেট কী?

ওয়াক্‌ফ অধ্যাদেশ ১৯৬২ এর ধারা-২ (১১).ক এ বলা হয়েছে ‘ওয়াক্‌ফ এস্টেট বলিতে সামগ্রিকভাবে (সম্পূর্ণরূপে) স্থাবর সম্পত্তি, যত দূর সম্ভব (as well as), অস্থাবর সম্পত্তি, যাহা একটি দলিল মূলে ওয়াক্‌ফ করা  হইয়াছে; এবং কোন ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ এস্টেটের পদবাচ্য হইবে না যদি উহা কেবল মাত্র অস্থাবর সম্পত্তি দ্বারা সৃষ্ট হয়’


মুতওয়াল্লি
ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনাকে মুতওয়াল্লি বলা হয়। তিনি আল্লাহর অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে ওয়াকফ সম্পত্তির দেখভাল করেন। তাঁকে মৌখিকভাবে কিংবা যে চুক্তি বা দলিল অনুযায়ী ওয়াকফ করা হয়েছে তার দ্বারা নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওয়াকিফ অর্থাৎ (উৎসর্গকারী) ওয়াকফকারী নিজেকেও মুতওয়াল্লি হিসেবে নিযুক্ত করতে পারেন। ওয়াকফ দলিলে তিনি মুতওয়াল্লি-পরম্পরার রীতি-নিয়মও করে যেতে পারেন। ওয়াকফের মাধ্যমে সম্পত্তি পুরোপুরি আল্লাহর মালিকানায় স্থানান্তরিত হওয়ায় ওয়াকিফ ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপকের মর্যাদায় আসীন হন; আর সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারেন না। ওয়াক্ফ দলিলে ভিন্নভাবে মুতওয়াল্লি করার বিধান থাকায় মুতওয়াল্লি তার উত্তরাধিকারী নিয়োগ করতে পারেন।

ওয়াকফ প্রপার্টি একটি লিগ্যাল পার্সন বা আইনগত স্বত্বা। যার পক্ষে পরিচালক থাকতে হয়। যাকে পরিভাষায় মোতায়াল্লি বা নাজিরুল ওয়াকফ বলা হয়। মোতাওয়াল্লি দাতা কর্তৃক নিযুক্ত হতে পারে বা প্রশাসন ও আদালত কর্তৃকও হতে পারে। তিনি মূলত প্রপার্টির পক্ষে প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেন। (মাসউলিয়্যাতুল ওয়াকফ : ৫০)। ওয়াকফ অধ্যাদেশ ১৯৬২-তে বলা হয়েছে, মোতাওয়াল্লি হলো, ওয়াকফ করার সময় বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিত, মৌখিক বা অন্য কোনো উপায়ে ওয়াকফ পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ব্যক্তি। মোতাওয়াল্লির প্রতিনিধি বা মোতাওয়াল্লির কার্য পরিচালনার জন্য অন্য কোনো নিযুক্ত ব্যক্তি। অপারগ বা অসুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মোতাওয়াল্লির ওসি বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা কমিটি, যারা ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিযুক্ত থাকে।

কারা মুতাওয়াল্লি হতে পারবেন / মোতাওয়াল্লির যোগ্যতা:
১. শরিয়ার আলোকে মোতাওয়াল্লির প্রধানত দুটি চরিত্রঃ এক. প্রতিনিধি, দুই. কর্তৃত্বকারী।
এ দুটি চরিত্রের জন্য প্রতিবন্ধক কোনো দোষ থাকতে পারবে না। যেমন:  শরিয়ার দৃষ্টিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক, নির্বোধ, পাগল বা বিকারগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি। (শরিয়া স্ট্যান্ডার্ড ২৩, ধারা : ৩/২)।
২. মোতাওয়াল্লি আমানতদার ও বিশ্বস্ত হওয়া আবশ্যক। সুতরাং কোনো প্রমাণিত খেয়ানতকারী ব্যক্তি মোতাওয়াল্লি হওয়ার উপযুক্ত নয়। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৩৮৫)।
৩. মোতাওয়াল্লি নিজের কাজ নিজে সম্পাদন করতে বা তার কোনো প্রতিনিধি দ্বারা হলেও কাজ করাতে সক্ষম হতে হবে। (প্রাগুক্ত)।
৪. মুসলিম হওয়া। অমুসলিম ব্যক্তি মোতাওয়াল্লি হওয়ার উপযুক্ত নয়। (সুরা নিসা ৪:১৪১)।

যেকোনো সুস্থ, প্রাপ্ত বয়স্ক ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম ব্যক্তি মুতাওয়াল্লি হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। অবশ্য একজন অপ্রাপ্ত শিশুও মুতাওয়াল্লি হতে পারে যদি ওয়াকফ সম্পত্তি বংশীয় ধারায় পরিচালিত হয়ে আসে অথবা ওয়াকফ দলিলে উত্তরাধিকারীদের তত্ত্বাবধানের শর্তারোপ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনার ভার শিশুর ওপর ন্যস্ত হবে।
মোতাওয়াল্লির মধ্যে উপরিউক্ত মৌলিক ৪টি যোগ্যতা থাকা জরুরি।
কারণ ওয়াকফ প্রপার্টির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, তা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং তা থেকে উৎপাদন করে বেনিফিসিয়ারিদের মাঝে বিতরণ করা; আর ওয়াকফকারীর সদকায়ে জারিয়া প্রাপ্তির উদ্দেশ্য সফল করা।
সুতরাং একজন মোতাওয়াল্লি আমানতদার বিচক্ষণ দায়িত্ববোধ সম্পন্ন সুবুদ্ধির অধিকারী ও মুসলিম হওয়া ছাড়া উক্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হওয়ার আশা করা যায় না।
নারীদের মুতাওয়াল্লি হওয়ার ক্ষেত্রে আইনত কোনো বাধা নেই। কিন্তু যেখানে মুতাওয়াল্লিকে নানামুখী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে হয় সেখানে নারী ও অমুসলিমরা মুতাওয়াল্লি হতে পারে না।

ওয়াকফ আইনে মুতাওয়াল্লির কর্মপরিধি ও ক্ষমতা
মুসলিম আইন অনুসারে মুতাওয়াল্লি ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপক। ইসলামী আইনানুসারে ওয়াকফ সম্পত্তিতে মুতাওয়াল্লির ওপর সম্পত্তি ন্যস্ত নয়। মুতাওয়াল্লি একজন ব্যবস্থাপক বা পরিচালক মাত্র। আধুনিক আইনের ‘ট্রাস্টি’র সঙ্গে মুতাওয়াল্লির প্রায়োগিক পার্থক্য আছে।

মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব
১. প্রপার্টি সংরক্ষণ ও যত্ন করা।
২. মেরামত, সংস্কার ও উন্নয়ন করা।
৩. ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে তার উপযোগ বৃদ্ধি করা।
৪. চাষাবাদযোগ্য জমিতে ফসল ফলানো।
৫. ওয়াকফের সম্পদ থেকে উৎপন্ন উপযোগ বেনিফিসিয়াদের মাঝে শরিয়া-সম্মতভাবে বিতরণ করা।
৬. অডিট ও হিসাব সংরক্ষণ করা।
৭. ওয়াকফনামার শর্তাবলি যথাযথ বাস্তবায়ন করা। তবে শরিয়াবিরোধী কোনো শর্ত থাকলে বা ওয়াকফ প্রপার্টি অথবা বেনিফিসিয়াদের অধিকার খর্ব হয়, এমন কোনো শর্ত থাকলে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। (ফিকহ বিশ্বকোষ, কুয়েত : ৪৪/৩১ ও ১০৯)।

মুতাওয়াল্লির ক্ষমতা
মুতাওয়াল্লি ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। যে উদ্দেশ্যে সম্পদ ওয়াকফ করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি সম্পত্তি ব্যবহারের পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। আদালতের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে তিনি সম্পত্তি বিচ্ছিন্ন (বিক্রি বা দান) করার ক্ষমতা রাখেন। আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া এমনটি করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। ওয়াকফ আইন ১৯৫৪ কার্যকর হওয়ার আগে মুতাওয়াল্লি ওয়াকফ বিষয়ে মামলা দায়ের করার ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু বর্তমান আইনে এই ক্ষমতা কেবল ওয়াকফ বোর্ডকেই দেওয়া হয়েছে।

মুতাওয়াল্লি কে নিয়োগ দেবে
নিম্নোক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ মুতাওয়াল্লি নিয়োগ ও প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখেন। তাঁরা হলেন—

১. প্রতিষ্ঠাতা : ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাতা মুতাওয়াল্লি নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা রাখেন। তিনি নিজেকেও প্রথম মুতাওয়াল্লি ঘোষণা করতে পারেন। তিনি পরবর্তী মুতাওয়াল্লি নিয়োগে বিধি-নিষেধ প্রণয়ন করতে পারেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তিকেও মুতাওয়াল্লি নিয়োগ দিতে পারেন।

২. মুতাওয়াল্লি : যদি কোথাও প্রতিষ্ঠাতা বা ওয়াকিফ (ওয়াকফকারী) মারা যান এবং আগে থেকে মুতাওয়াল্লি নিয়োগে কোনো নীতিমালা না থাকে, তবে বর্তমান মুতাওয়াল্লি তাঁর মৃত্যুশয্যায় বা শারীরিক সামর্থ্য হারানোর পর তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে পারবেন। যদি যৌথ মুতাওয়াল্লিদের একজন মারা যান এবং ওয়াকফনামায় এই বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকে, তবে অবশিষ্টদের একজন ওফাকফ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন।

৩. আদালত : যখন প্রতিষ্ঠাতা বা ওয়াকিফ কোনো মুতাওয়াল্লি নিয়োগ না দেন অথবা তিনি মুতাওয়াল্লি হওয়ার যোগ্যতা না রাখেন, তখন আদালত একজন মুতাওয়াল্লি নিয়োগ দিতে পারবেন।
জেলা আদালতের ওপরই মুতাওয়াল্লি নিয়োগের দায়িত্ব বর্তাবে। মুতাওয়াল্লি নিয়োগের সময় আদালত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করবেন—
ক. আদালত নিয়ন্ত্রণকারীদের নির্দেশনা উপেক্ষা করবেন।
খ. তবে অপরিচিত ব্যক্তির ওপর বর্তমান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেবেন।

৪. সংঘবদ্ধ মানুষ : মসজিদ ও কবরস্থানের মতো যেসব ওয়াকফ সম্পদ পুরোপুরি স্থানীয়, সেখানে সংঘবদ্ধ স্থানীয় মানুষ মুতাওয়াল্লি নিয়োগ দিতে পারবে।

 

মুতাওয়াল্লিকে বরখাস্ত করা :
মুতাওয়াল্লি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠাতা কোনো ব্যক্তিকে বরখাস্ত করার অধিকার রাখেন না। যদি না, ওয়াকফনামায় তাঁকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়। কোর্ট মুতাওয়াল্লি বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখেন। আদালত ভুলভ্রান্তি, বিশ্বাসভঙ্গ, অযোগ্যতা অথবা যেকোনো গ্রহণযোগ্য কারণে মুতাওয়াল্লি বরখাস্ত করতে পারেন।

 

বর্তমানে মানুষ যা করে তা আসলে সাহাবীগণের কাজের বিপরীত। কেননা বর্তমানে মানুষ সাধারণত অসিয়ত করে থাকেন, ওয়াকফ করেন না।

মুসলিম সমাজে বর্তমানে ওয়াকফর ধারণা তেমন পরিচিত নয়। মানুষ এ বিষয়ে কোনো ধারনাই রাখতে চায় না। 

একজন মুসলিমের জন্য বাঞ্ছনীয় হলো বিভিন্ন খাতে সদকা করা; যাতে করে প্রত্যেক শ্রেণীর নেক আমলকারীদের সাথে তার একটি ভাগ থাকে।
তাই আপনি আপনার সম্পদের
একটি অংশ রোযাদারদের ইফতার করানোর জন্য বরাদ্দ করুন।
অপর একটি অংশ ইয়াতীমদের প্রতিপালনের জন্য বরাদ্দ করুন।
তৃতীয় একটি অংশ বৃদ্ধাশ্রমের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বরাদ্দ করুন।
চতুর্থ একটি অংশ দিয়ে মসজিদ নির্মাণে অংশ গ্রহণ করুন।
পঞ্চম একটি অংশ দিয়ে বই ও মুসহাফ বিতরণের জন্য রাখুন…।

 

ওয়াক্ফ আইনের বিবর্তনঃ-

১৯১৩ সালে ওয়াক্ফ ভেলিডেটিং এ্যক্ট
১৯৩০ সালে ওয়াক্ফ ভেলিডেটিং এ্যক্ট সংশোধন
১৯৩৪ সালের বঙ্গীয় ওয়াক্ফ আইন
১৯৬২ সালের ওয়াক্ফ অধ্যাদেশ
ওয়াক্ফ অধ্যাদেশ সংশোধন আইন ২০১৩
ওয়াক্ফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইন ২০১৩

ওয়াকফের আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াকফকারীর পরিবারের এক সদস্য প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করলে আদালত পরলোকগত দানকারীর পক্ষে রায় দেন।
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে আবুল ফাতা মোহাম্মদ বনাম রসময় মামলার রায়ে প্রিভি কাউন্সিল ওয়াকফ-আলাল-আওলাদকে অবৈধ ঘোষণা করে। তখন এই রায়কে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের লঙ্ঘন বলে ভারত সরকারের কাছে অভিযোগ করা হয়।
১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমান ওয়াকফ বৈধকরণ আইন পাস হয়; যার ফলে প্রিভি কাউন্সিলের ওই রায়টি অকার্যকর গণ্য হয়।
পরে বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্ট ১৯৩৪ দ্বারা ওয়াকফ ভূসম্পত্তির ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়।
১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ওয়াকফ অধ্যাদেশের অধীন ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইনের আরও কিছু সংশোধন করা হয়।
১৯৮৮ সালের ওয়াকফ অধ্যাদেশ ও ১৯৯৮ সালের ওয়াকফ অধ্যাদেশ দ্বারাও ওই আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। 

 

ওয়াকফ প্রশাসন:

বর্তমানে একটি ওয়াকফ ডাইরেক্টরেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে।
ওয়াকফ সম্পত্তি ওয়াকফ প্রশাসনের কার্যালয়ে তালিকাভুক্ত করতে হয়, না করা একটি ফৌজধারী অপরাধও বটে।
সাধারণত ওয়াকফ পরিচালনা জন্যে রাষ্ট্রীয় কিছু বিধান ও প্রতিষ্ঠান থাকে। সেখানে একজন প্রশাসক নিযুক্ত থাকেন। (মুতাওয়াল্লি বা আইয়াইম নামক) নিয়োগ করে এবং পরবর্তী প্রশাসক নিয়োগের জন্য নিয়মগুলো নির্ধারণ করে।

প্রতিষ্ঠাতা নিজের জীবনকালে ওয়াকফ পরিচালনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে, তবে, সুবিধাভোগী সংখ্যা বেশ সীমিত। সেক্ষেত্রে প্রশাসক ছাড়াও সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়াকফের যত্ন নিতে পারে।

ইসলামী আইনের অধীনে ওয়াকফ প্রশাসক দায়িত্বশীল অন্যান্য ব্যক্তিদের মতো, আইন ও চুক্তি করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
উপরন্তু, বিশ্বস্ততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন হয়।
ইসলামী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক মুসলিম হওয়া শর্ত জুড়িয়ে দিয়েছেন। তবে হানাফি মাজহাব এর প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

বিলুপ্ত:
ওয়াকফ চিরস্থায়ী হতে এবং চিরতরে স্থায়ী উদ্দেশ্যে করা হয়।
তা সত্ত্বেও, ইসলামী আইনটি এমন শর্তগুলোর উপর নজর রাখে যার অধীনে ওয়াকফ বাতিল করা যেতে পারে।

ওয়াকফের অন্যান্য বিধানের মধ্যে রয়েছে:

ওয়াকফকারীর শর্ত মোতাবেক কাজ করা; যদি সেটা শরিয়ত বিরোধী না হয়।
যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “মুসলমানেরা তাদের শর্তাবলির উপর অটল থাকবে; শুধু এমন কোন শর্ত ছাড়া, যে শর্ত কোন হালালকে হারাম করে কিংবা কোন হারামকে হালাল করে।” 
কেননা উমর (রাঃ) ওয়াকফ করেছেন এবং সে ওয়াকফের মধ্যে শর্ত করেছেন। যদি শর্ত অনুসরণ করা ওয়াজিব না হয় তাহলে এমন শর্ত করার তো কোন অর্থ হয় না।
তাই ওয়াকফকারী যদি ওয়াকফ সম্পত্তির অংশ বিশেষের ক্ষেত্রে শর্ত করেন কিংবা কোন শ্রেণীর হকদারকে অপর শ্রেণীর হকদারদের উপর অগ্রাধিকার দেওয়ার শর্ত করেন কিংবা সকল হকদারের ক্ষেত্রে শর্ত করেন কিংবা বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যদারী হকদার হওয়ার শর্ত করেন কিংবা বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য না থাকার শর্ত করেন কিংবা ওয়াকফ সম্পত্তি তত্ত্বাবধান করার শর্ত করেন কিংবা অন্য কোন শর্ত করেন তাহলে উক্ত শর্ত কার্যকর করা আবশ্যক; যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী না হয়।

যদি ওয়াকফকারী কোন শর্ত না করেন সেক্ষেত্রে হকদার হিসেবে গরীব-ধনী, নর-নারী সবাই সমান। যদি ওয়াকফকারী কোন মুতাওয়াল্লি (তত্ত্বাবধায়ক) নিযুক্ত না করেন কিংবা যাকে নিযুক্ত করেছেন তিনি মারা যান তাহলে যার জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে তিনি যদি সুনির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি হন তিনিই ওয়াকফের তত্ত্বাবধান করবেন। আর যদি মসজিদের মত কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়াকফ করা হয় কিংবা এমন সংখ্যক মানুষের জন্য ওয়াকফ করা হয় যাদের সংখ্যা অগণিত, যেমন গরীব-মিসকীন; সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধান এই ওয়াকফ সম্পত্তি তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব পালন করবেন কিংবা তার কোন প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দিবেন।

মুতাওয়াল্লি বা তত্ত্বাবধায়কের উপর ওয়াজিব আল্লাহ্‌কে ভয় করা এবং যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা। কেননা এটি আমনত; যার দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

যদি কেউ তার সন্তানদের জন্য ওয়াকফ করে যান তাহলে অধিকারের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে সবাই সমান। যেহেতু তিনি তাদের সকলকে অংশীদার বানিয়েছেন। কোন জিনিস অংশীদারিত্বভিত্তিক হওয়ার অর্থ হচ্ছে এতে সকলের অধিকার সমান। যেমনিভাবে তাদের অনুকূলে যদি কোন কিছু অনুমোদন করা হয় তাহলে তাদের সকলের ভাগ সমান। তদ্রূপ তাদের জন্য কোন কিছু ওয়াকফ করা হলে সেটাও এমন। ওয়াকফকারীর ঔরশজাত সন্তানদের পর এটি তার ছেলেদের সন্তানদের মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে; মেয়েদের সন্তানদের জন্য নয়। কেননা মেয়েদের সন্তানরা হচ্ছে অন্য লোকের সন্তান; তাদেরকে তাদের পিতাদের দিকে সম্বোধিত করা হয়। এবং যেহেতু তারা আল্লাহ্‌ তাআলার এ বাণী “আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকারের) ব্যাপারে আদেশ দিচ্ছেন”-এর মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত নয়। আলেমদের মধ্যে কারো কারো অভিমত হচ্ছে “সন্তান” শব্দের মধ্যে তারাও অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা মেয়েরা ওয়াকফকারীর সন্তান। অতএব, মেয়েদের সন্তানেরা প্রকৃতপক্ষে তার সন্তানদের সন্তান। আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

কেউ যদি বলেন: “আমার ছেলেদের জন্য ওয়াকফকৃত” কিংবা “অমুকের ছেলেদের জন্য ওয়াকফকৃত” তাহলে ওয়াকফকৃত সম্পত্তি শুধু পুরুষ ছেলেদের জন্য খাস হবে। কারণ “ছেলে” শব্দটি শুধু তাদের জন্যই গঠন করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “নাকি তাঁর জন্য মেয়ে আর তোমাদের জন্য ছেলে?” তবে সম্পত্তিটি যদি গোত্র হিসেবে তাদের জন্য ওয়াকফ করা হয়; যেমন বনু হাশেম ও বনু তামীমের জন্য সেক্ষেত্রে নারীরাও এর মধ্যে প্রবেশ করবে। কেননা “গোত্র” অভিধা নর-নারী সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে।

কিন্তু যদি সীমিত সংখ্যক কোন জনসমষ্টির জন্য ওয়াকফ করা হয় তখন তাদের সকলকে সমান অংশ দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু যদি তাদের সংখ্যা অগণিত হয়; যেমন- বনু হাশেম ও বনু তামীম; তখন সকলকে অংশ দেওয়া আবশ্যক নয়। কেননা সেটা সম্ভবপর নয়। তাই তাদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তিকে অংশ দেওয়া এবং কিছু অংশীদারকে অপর অংশীদারদের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া জায়েয।

ওয়াকফ – এমন চুক্তিসমূহের অন্তর্ভুক্ত যা কেবল কথার মাধ্যমে অনিবার্য হয়ে যায়। তাই এটি বাতিল করা জায়েয নয়। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “এর মূল সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না, হেবা করা যাবে না এবং উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করা যাবে না”। ইমাম তিরমিযি বলেন: “এ হাদিসের উপর আলেমগণ আমল করছেন।”    

তাই ওয়াকফ বাতিল করা যাবে না। কেননা সেটি চিরস্থায়ী; বিক্রয় ও স্থানান্তরযোগ্য নয়। তবে যদি ওয়াকফ সম্পত্তির উপযোগ একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যায়; যেমন ঘর হলে সেটা ধ্বসে পড়ল এবং ওয়াকফের আয় থেকে এ ঘর মেরামত করা না যায় কিংবা চাষের জমি হলে সেটা বিরান হয়ে যায়, অনাবাদী হয়ে যায়। সাধারণ উপকরণ দিয়ে সেটাকে আবাদ করা না যায় এবং এটাকে আবাদ করার মত ওয়াকফের আয় না থাকে; এমন ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে এর মূল্য দিয়ে একই ধরণের ওয়াকফ করা হবে। যেহেতু ওয়াকফকারীর উদ্দেশ্যের এটাই সবচেয়ে নিকটবর্তী। যদি পুরোপুরি একই ধরণের ওয়াকফ করা সম্ভবপর না হয় তাহলে সম ধরণের ছোট পর্যায়ের ওয়াকফ করা হবে। খরিদ করার সাথে সাথে প্রতিস্থাপিত সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেবে গণ্য হবে।

আর যদি ওয়াকফ সম্পত্তিটি মসজিদ হয় এবং ঐ এলাকা বিরান হয়ে পড়ায় মসজিদটি পরিত্যক্ত হয়ে যায় তাহলে সে মসজিদটি বিক্রি করে দিয়ে এর মূল্য অন্য কোন মসজিদের কাজে লাগানো হবে। যদি কোন মসজিদের আয় মসজিদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয় তখন অতিরিক্ত আয় অন্য মসজিদের কাজে লাগানো জায়েয। যেহেতু অতিরিক্ত আয় একই ধরণের ওয়াকফের কাজে লাগানো হল। মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তির অতিরিক্ত আয় গরীবদের মাঝে বণ্টন করাও জায়েয।

আর যদি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির জন্য ওয়াকফ করা হয়; যেমন কেউ যদি এভাবে বলে যে: ‘এটি যায়েদের জন্য ওয়াকফকৃত প্রতি বছর এর থেকে একশ তাকে দেওয়া হবে।’ যদি ওয়াকফের আয় এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে অতিরিক্ত আয় সঞ্চয় করা হবে। শাইখ তাকী উদ্দীন (রহঃ) বলেন: যদি জানা যায় যে, ওয়াকফের আয় সবসময় বেশি হবে তাহলে সেটা বণ্টন করা আবশ্যক। কেননা সেটা জমিয়ে রাখা মানে সেটাকে নষ্ট করা।

আর যদি কোন মসজিদের জন্য ওয়াকফ করা হয়; কিন্তু মসজিদটি নষ্ট হয়ে যায় এবং ওয়াকফ থেকে সেটা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভবপর না হয় তাহলে সেটা অনুরূপ কোন মসজিদের জন্য ব্যয় করা হবে।

প্রত্যেক ব্যক্তিই ওয়াকফ করার পাশাপাশি অসিয়তও করতে পারেন। তবে ওয়াকফ ও অসিয়তের মধ্যে পার্থক্য আছে।

Difference between Waqf and Osiot (ওয়াকফ ও অসিয়তের মধ্যে পার্থক্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.